:
Breaking News

চার্লি চ্যাপলিন : হাসির আড়ালে এক ভবঘুরে দার্শনিক

চার্লি চ্যাপলিন : হাসির আড়ালে এক ভবঘুরে দার্শনিক

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন,যাঁদের কীর্তি কোনও একটি সময়,দেশ বা ভাষার গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়।চার্লি চ্যাপলিন তাঁদেরই একজন।তিনি শুধু একজন অভিনেতা ছিলেন না,ছিলেন অভিনেতা,পরিচালক,চিত্রনাট্যকার,সুরকার এবং সর্বোপরি মানুষের জীবনকে গভীরভাবে অনুভব করতে পারা এক অসাধারণ শিল্পী।তাঁর হাসির মধ্যে ছিল কান্না, তাঁর কৌতুকের মধ্যে ছিল সমাজের কঠিন বাস্তবতা, আর তাঁর ভবঘুরে চরিত্রের মধ্যে লুকিয়ে ছিল মানবিক মর্যাদার এক গভীর দর্শন।একটি বহুল প্রচলিত গল্পে বলা হয়, আলবার্ট আইনস্টাইন একবার চ্যাপলিনকে বলেছিলেন, তাঁর শিল্পের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল তার সর্বজনীনতা - কোনও সংলাপ ছাড়াই সারা পৃথিবীর মানুষ তাঁকে বুঝতে পারে। চ্যাপলিন নাকি উত্তরে বলেছিলেন,আইনস্টাইনের খ্যাতি আরও বড়; কারণ পৃথিবীর মানুষ তাঁকে প্রশংসা করে, অথচ তাঁকে বোঝে না। কথোপকথনটি সত্যিই ঘটেছিল কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এই গল্পটি চ্যাপলিনের বুদ্ধিদীপ্ত রসবোধের একটি চমৎকার প্রতিচ্ছবি।চ্যাপলিনের জীবন কিন্তু তাঁর চলচ্চিত্রের মতো মসৃণ ছিল না।লন্ডনের দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মানুষটির শৈশব কেটেছে অভাব, অনিশ্চয়তা এবং কঠোর বাস্তবতার মধ্যে।অল্প বয়সেই তাঁকে উপার্জনের জন্য মঞ্চে নামতে হয়।মাত্র ১৪ বছর বয়সে তাঁর মা মানসিক অসুস্থতার কারণে হাসপাতালে ভর্তি হন। জীবনের শুরুতেই তিনি চিনেছিলেন ক্ষুধা,দারিদ্র্য,অপমান এবং অনিশ্চয়তাকে। সম্ভবত সেই কারণেই পরবর্তীকালে তাঁর সৃষ্টিশীলতার কেন্দ্রে বারবার ফিরে এসেছে সাধারণ মানুষ।তাঁর অমর চরিত্র ‘দ্য ট্র্যাম্প’,মাথায় বোলার হ্যাট, পরনে ঢোলা প্যান্ট,হাতে ছড়ি, মুখে চিরচেনা গোঁফ - ছিল একই সঙ্গে হাস্যকর ও মর্মস্পর্শী।সে সমাজের প্রান্তিক মানুষ, কিন্তু তার আত্মমর্যাদা অটুট।সে দরিদ্র, কিন্তু পরাজিত নয়।সে ক্ষুধার্ত,কিন্তু মানুষের প্রতি তার মমতা অটুট। আমেরিকায় গিয়ে চ্যাপলিনের প্রতিভা পূর্ণ বিকাশ লাভ করে। নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগে তিনি একের পর এক অসাধারণ ছবি তৈরি করেন।শুধু অভিনয় নয়, ছবির চিত্রনাট্য লেখা,পরিচালনা, প্রযোজনা এবং সৃষ্টিশীল নিয়ন্ত্রণ,সব ক্ষেত্রেই তিনি নিজের দক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন।নিজের চলচ্চিত্রের ওপর এই পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দিয়েছিল।তাঁর জনপ্রিয়তা তাঁকে বিপুল অর্থ ও স্বাধীনতা দিয়েছিল,আর সেই স্বাধীনতাকে তিনি ব্যবহার করেছিলেন নিজের মতো করে চলচ্চিত্র নির্মাণে।কিন্তু খ্যাতির সঙ্গে এসেছিল বিতর্কও।চ্যাপলিনের রাজনৈতিক ও মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে আমেরিকার তৎকালীন রক্ষণশীল রাজনৈতিক পরিবেশের একাংশের বিরাগভাজন করে তোলে।বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকায় কমিউনিজম-বিরোধী প্রবল পরিবেশের সময় তাঁর ওপর সন্দেহের দৃষ্টি পড়ে।তাঁকে ‘কমিউনিস্ট’ বলে অভিযুক্ত করা হলেও তিনি নিজে সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন।১৯৫২ সালে ইউরোপ সফরে যাওয়ার সময় চ্যাপলিন জানতে পারেন, তাঁর আমেরিকায় পুনঃপ্রবেশের অনুমতি নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে।এরপর তিনি আর আমেরিকায় ফিরে বসবাস করেননি।স্ত্রী উনা ও সন্তানদের নিয়ে তিনি সুইজারল্যান্ডে বসতি স্থাপন করেন।জেনেভা হ্রদের তীরে তাঁর দীর্ঘদিনের সেই বাড়িই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়ের ঠিকানা।সুইজারল্যান্ডে তাঁর জীবন ছিল অনেক বেশি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক।সন্তানদের স্মৃতিতে তিনি ছিলেন একদিকে কঠোর নিয়মানুবর্তী বাবা, অন্যদিকে অসাধারণ রসিক মানুষ।বাড়িতে খাওয়ার সময় নিয়ম মানতে হতো।পড়াশোনা ও আদবকায়দার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন।সন্তানদের তিনি বোঝাতেন,জীবনে যে কাজই করো,তা যেন ভালোভাবে করো। চ্যাপলিনের এই দৃষ্টিভঙ্গির শিকড় ছিল তাঁর নিজের শৈশবের অভিজ্ঞতায়।দারিদ্র্য তাঁকে শিখিয়েছিল জীবনের কঠিন সত্য। তাই নিজের সন্তানদের তিনি আরাম-আয়েশের মধ্যে বড় করলেও তাঁদের যেন সাধারণ মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে যেতে হয়,সে বিষয়ে সতর্ক ছিলেন।এই মানবিক দর্শনের সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ পাওয়া যায় তাঁর মেয়ে জেরালডিনকে লেখা একটি বিখ্যাত চিঠিতে। সেখানে তিনি মেয়েকে শুধু অভিনয় ও সৌন্দর্যের কথা বলেননি;বলেছেন মানুষের কথা ভাবতে। তিনি সতর্ক করেছিলেন, দর্শকের প্রশংসা যেন তাকে বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন না করে। চ্যাপলিন যেন মেয়েকে বলতে চেয়েছিলেন - মঞ্চে তুমি রাজকন্যা হতে পারো, কিন্তু মঞ্চের বাইরে তুমি আর পাঁচজন মানুষের মতোই একজন মানুষ।শিল্পী হিসেবে যত ওপরে উঠবে, তত বেশি মনে রাখতে হবে মাটির মানুষদের কথা।রাস্তায় যারা ক্ষুধার্ত অবস্থায় দিন কাটায়, শীতে কাঁপে, জীবিকার জন্য লড়াই করে - তাদের জীবনকে ভুলে গেলে শিল্পও অসম্পূর্ণ হয়ে যায়।তিনি মেয়েকে আরও বোঝাতে চেয়েছিলেন,মানুষের প্রতি সহানুভূতি কোনও দয়া নয়;এটি মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ব।ট্যাক্সিচালকের সঙ্গে কথা বলতে, তাঁর পরিবার কেমন আছে জানতে,প্রয়োজনে তাকে সাহায্য করতে - এমন ছোট ছোট উদাহরণের মধ্য দিয়ে চ্যাপলিন আসলে শেখাতে চেয়েছিলেন,মানুষের মর্যাদাকে সম্মান করাই প্রকৃত সভ্যতা। চিঠিতে অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তিনি যে শিক্ষা দিয়েছিলেন, তা আজও প্রাসঙ্গিক।নিজের জন্য যতটা খরচ করবে, তার পাশাপাশি এমন মানুষের কথাও ভাববে,যার প্রয়োজন তোমার চেয়ে বেশি।অর্থাৎ সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ববোধ না থাকলে সেই সাফল্যের মূল্য খুব বেশি নয়। চ্যাপলিন সন্তানদের অন্ধ আনুগত্যও চাননি।তিনি চেয়েছিলেন তাঁরা তাঁর সঙ্গে তর্ক করুক,তাঁর মতামতকে যুক্তি দিয়ে প্রশ্ন করুক, নিজেদের স্বাধীন চিন্তা গড়ে তুলুক।এই শিক্ষার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল তাঁর গণতান্ত্রিক ও মানবিক মানসিকতা।চ্যাপলিনের জীবন তাই কেবল চলচ্চিত্রের ইতিহাস নয়; এটি একজন শিল্পীর আত্মসংগ্রামের ইতিহাস।যে মানুষটি ছোটবেলায় ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দেখেছিলেন,তিনিই পরবর্তীকালে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষকে হাসিয়েছেন।কিন্তু তাঁর হাসি কখনও নিছক বিনোদন ছিল না।সেই হাসির আড়ালে তিনি দেখিয়েছেন সমাজের বৈষম্য, মানুষের অসহায়ত্ব,ক্ষমতার নিষ্ঠুরতা এবং বেঁচে থাকার সংগ্রাম।১৯৭২ সালে, দীর্ঘ দুই দশক পর চ্যাপলিন আবার আমেরিকার মাটিতে পা রাখেন। তখন তাঁর বয়স ৮৩। চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে সম্মানসূচক অস্কার প্রদান করা হয়।অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দর্শকদের করতালি তাঁর প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধারই বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিল।কিন্তু শরীর তখন আর সঙ্গ দিচ্ছিল না। জীবনের শেষ কয়েক বছর তিনি সুইজারল্যান্ডেই কাটান। ১৯৭৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর, বড়দিনের সকালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।চ্যাপলিন চলে গেছেন বহু বছর আগে। কিন্তু তাঁর ‘দ্য ট্র্যাম্প’ আজও পৃথিবীর মানুষের স্মৃতিতে জীবন্ত। কারণ সেই ভবঘুরে চরিত্রটি আসলে কোনও একজন মানুষের গল্প নয় - এটি পৃথিবীর অসংখ্য প্রান্তিক মানুষের প্রতীক।সত্যজিৎ রায় চ্যাপলিনের শিল্পীসত্তার অসাধারণত্বের কথা বহুবার উল্লেখ করেছেন।চলচ্চিত্রের বিভিন্ন সৃজনশীল ভূমিকাকে একত্রে ধারণ করার যে বিরল ক্ষমতা চ্যাপলিনের ছিল, তা তাঁকে বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।চ্যাপলিনের শারীরিক উচ্চতা হয়তো খুব বেশি ছিল না, কিন্তু শিল্পী হিসেবে তাঁর উচ্চতা ছিল আকাশছোঁয়া।তাঁর হাতে থাকা ছড়ি, মাথার বোলার হ্যাট,মুখের ছোট গোঁফ এবং সেই বিশেষ হাঁটার ভঙ্গি আজও চলচ্চিত্রের এক বিশ্বজনীন ভাষা।চার্লি চ্যাপলিন আমাদের শিখিয়েছেন - হাসি কখনও কখনও প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে।কৌতুক কখনও সমাজের আয়না হয়ে উঠতে পারে।আর একজন ভবঘুরেও মানুষের আত্মমর্যাদা, ভালোবাসা ও স্বাধীনতার কথা বলতে পারেন।তাই চ্যাপলিনকে শুধু ‘বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেতা’ বললে তাঁর প্রতি অবিচার করা হয়। তিনি ছিলেন এক শিল্পী,যিনি মানুষের চোখে জল এনে হাসিয়েছেন; দারিদ্র্যের ভিতর থেকেও মানবিকতার সৌন্দর্য দেখিয়েছেন;আর চলচ্চিত্রকে বিনোদনের সীমা ছাড়িয়ে মানুষের জীবনের গভীরতম অনুভূতির ভাষায় পরিণত করেছেন।চার্লি চ্যাপলিন তাই শুধু একটি নাম নন - তিনি এক অনন্ত শিল্পভাষা। যে ভাষা সংলাপ ছাড়াই পৃথিবীর মানুষ বুঝতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *